Home / Neww / এক নজরে মিরপুর শহরের রহস্য দেখে নিন।

এক নজরে মিরপুর শহরের রহস্য দেখে নিন।

মিরপুর ঢাকা শহরের একটি থানা। এর উত্তরে পল্লবী থানা, দক্ষিণে মোহাম্মদপুর থানা, পূর্বে কাফরুল ও পল্লবী থানার একাংশ এবং পশ্চিমে সাভার উপজেলা অবস্থিত।

মোঘল আমলের ঢাকার অনেক আভিজাত লোকের নামের আগে মীর শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ধারণা করা হয় কোন মীরের ভূ সম্পত্তির অন্তর্গত ছিল এলাকাটি, যা পরে মীরপুর বা মিরপুর নামে পরিচিতি লাভ করে২০১১ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে হয়েছিল ।

মিরপুর ও তার বিভিন্ন এলাকার নামকরণ এবং এর ভূমিরুপ আমাদের প্রাচীনত্ত অন্বেষনে দিক নির্দেশনা দিতে পারে। মিরপুরের ভূমিরুপ প্লাইস্টোসিন উঁচু ভূমির একটি ধারা এবং মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকা এবং সেনপাড়া পর্বতা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বে বর্তমান কাঁঠালবাগান পর্যন্ত প্লাইটোসিন যুগের সমতল ভূমির চিহ্ন বহন করছে (হক:২০১০)। ঢাকার প্রচীন উঁচুভূমি বলতে বুঝায় মিরপুর চিড়িয়াখানার উঁচু ভূমি ও সেনপাড়া পর্বতা থেকে পূর্ব-দক্ষিণে কাঁঠালবাগান পর্যন্ত উঁচু ভূমি, লালমাটিয়ার উঁচু ভূমি এবং লালবাগ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত উঁচু থেকে ক্রমশ ঢালু নিম্নভূমি অঞ্চল। ঢাকার এই বৈচিত্র্যময় ভূমি কাঠামোই ঢাকার অতীত ইতিহাসকে বৈচিত্র্যময়তা প্রদান করেছিল। বিচিত্র এই ভূমিরূপ সম্ভবত গুপ্ত পূর্ববর্তী সময় থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছিল (হক:২০১০), যেখানে সম্ভবত মিরপুরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল।

‘মীর’ শব্দটি একটি উপাধি যা সুলতানী ও মোগল উভয় সময়ই বিভিন্ন প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক নামের সঙ্গে ব্যবহৃত হতো (শাহনাওয়াজ:২০০৪)। আবার শব্দের শেষে পুর বা পুরা যুক্ত করে নাম মুসলিম আমলে উৎপত্তির সাক্ষ্য বহন করে (করিম:২০০৩)। সুতরাং মিরপুর নামকরণটি কোনসময়ের তা নিয়ে বিতর্ক থেকে যায়। ‘কাজীপাড়া’ নামটি মুসলমান শাসনামলের বলে মনে হয়, তবে সময়কাল সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছাতে পারি না। সেক্ষেত্রে গাবতলীর কোটবাড়ি, দিয়াবাড়ি, দড়িয়াঘাট, পাইকপাড়া, সেনপাড়া পর্বতা প্রভৃতি নামগুলির বিশ্লেষণ গুরুত্বের দাবি রাখে। ‘কোটবাড়ি’ কোনভাবেই মুসলিম যুগের শব্দ বা প্রশাসনিক একক নয়। ‘কোটবাড়ি’ নামটি প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। অতীতে দুর্গকে কোট/গড় (ক্ষুদ্র দুর্গ বিশেষ) বলা হতো (হক:২০১০)। এদেশে ছোট বড় নদীর গতিপথে অসংখ্য কোটবাড়ি বা কোন স্থানের নামের সঙ্গে কোট/গড় নাম যোগ করে স্থান নাম পাওয়া যায়, যেমন মহাস্থানগড় দুর্গনগরী এদের মধ্যে অন্যতম। ঢাকা মহানগর এলাকায় যে তিনটি এমন ক্ষুদ্র দুর্গের অস্তিত্বের কথা জানা যায়, তাদের মধ্যে মিরপুর ও গাবতলী বাসস্ট্যাণ্ড-এর মাঝামাঝি এক জায়গায় কোটবাড়ি এবং এর পাশে দিয়াবাড়ি, দরিয়াঘাট নামগুলো পাওয়া যায়। এই নামগুলো সম্ভবত প্রাচীন এবং তা সুলতানী পূর্বযুগের বলে ধারণা করা যায়। কারণ সুলতানী যুগ থেকে ধরে বর্তমান পর্যন্ত কখনো এখানে কোটবাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল বলে কোন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায় না।কোটবড়ি বর্তমানে গাবতলীর পর্বতা সিনেমা হলের ঠিক পিছনে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত। তুরাগ নদীর প্রবাহধারা বর্তমানে একটি খালের মত দেখালেও আদতে এটি ছিল একটি বিশাল নদী। সাভারের বিরুলিয়া ছিল এর উত্তর তীর এবং মিরপুরের উঁচু ভূমি ছিল এর দক্ষিণ তীর। সম্ভবত এই বিশালতার কারণেই এখানকার স্থানের নাম হয়েছে দিয়াবাড়ি এবং দরিয়াঘাট। ড. হকও একই মত পোষণ করেন। তুরাগ নদীর উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রাখার লক্ষ্যে এবং এই নদী পথে গমনাগমনকারী নৌযানগুলো থেকে খাজনা আদায় ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়ে এই স্থানটির (কোটবাড়ির অবস্থান) উপযোগিতা অনস্বীকার্য। অতীতে নদীপথসমূহে অবস্থিত কোটগুলো ছিল একেবারে নদীর পাড়ে, আকৃতি ছিল অনেকটা আয়তাকার। কেবলমাত্র নদীর দিক ছাড়া বাকী তিন দিকে পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটি কেটে উঁচু করা হতো। নিম্নভূমি এলাকার কাঁচা সড়কের মত এর দেয়াল উচুঁ করা হতো, আর মাটি কাটার কারণে তিন দিক দিয়েই থাকত পরিখার মতো। ফলে কোটের চারিদিকেই ছিল পানির প্রবাহ। মীরপুর কোটবাড়ি এলাকার চারপাশে ছিল গভীর পরিখা যা ৮০-র দশকেও দৃশ্যমান ছিল (হক:২০১০)। কোটবাড়ি এলাকার সামান্য পূর্বদিকে একটি জায়গার নাম ‘পাইকপাড়া’। ‘পাইক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সৈন্য, বিশেষত হিন্দু সৈন্যবাহিনীকে ‘পাইক বাহিনী’ বলা হতো। সুলতান ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম এ বাহিনীর ব্যবহার করেন (শাহনাওয়াজ:২০০৪)। এবং ‘পাড়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে লম্বাটে মহল্লা। প্রাচীনকাল থেকেই সৈন্যদের পাইক বলে অভিহিত করা হতো, এমনকি সুলতানী ও মোগল যুগে সৈন্যদের পাইক বলে অভিহিত করা হতো। সুতরাং পাইকপাড়ার পাইক কোন সময়ের নির্ণয় করা কঠিন। মিরপুরে শাহ আলী একজন সুফি ছিলেন। কোন তথ্যপ্রমাণে তিনি সৈন্যবাহিনী রেখেছিলেন বলে জানা নেই (হক:২০১০)। বাংলার সুলতানগণ ঢাকার এই অংশ ব্যবহার করেছিলেন কিংবা মোগল শাসকগণ ঢাকার এই অংশে কোন সামরিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে পাইকপাড়া নামটি সম্ভবত প্রাচীন এবং যেহেতু কোটবাড়ির ঠিক সন্নিকটেই পাইকপাড়ার অবস্থান এ দু’য়ের সাথে সম্পর্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রাচীন হলেও আবার কোন যুগের? মৌর্য, গুপ্ত নাকি পাল বা সেন সেই প্রশ্নও উঠে। পাইকপাড়ার পাশেই রয়েছে সেনপাড়া পর্বতা। এই সেন যদি সেনবংশীদের সেন হয় তবে ধরে নিতে হবে যে এই পাইকপাড়া অন্তত সেন যুগের। কিন্তু ড. হক দেখিয়েছেন এ সেনপাড়া পর্বতা এবং পাইকপাড়া সেন শাসনামলের নয় (হক:২০১০)। উপরন্তু তিনি যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করে বলেছেন যে সম্ভবত এখানে গুপ্তপূর্ববর্তী সময়কাল থেকেই এই এলাকার বৈচিত্রময় ভূমিরুপের কারণে এখানে মনুষ্য বসতি থাকার প্রবল সম্ভনা রয়েছে যা খ্রিষ্টীয় ৫ম শতকের সমসাময়িক হতে পারে।

About royalforce71

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Skip to toolbar